১৬ই আগস্ট, ২০২০ ইং, রবিবার

কাবা শরিফ হেফাজতে আব্দুল মুত্তালিবের বিচক্ষণতা

আপডেট: মে ৩১, ২০২০

| পিবিএন ডেস্ক

ইয়েমেনের শাসক ছিল আবরাহা। ইয়েমেনবাসীরা প্রতি বছর হজ উপলক্ষ্যে মক্কায় কাবা শরিফে সফর করতো। কাবা শরিফের হজ করতে আসা রোধ করতে আবরাহা ইয়েমেনে একটি সুরম্য অট্টালিকাসম গির্জা তৈরি করে। কিন্তু তার গির্জায় কেউ যাতায়াত না করায় এবং কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় আবরাহা ইয়েমেনবাসীদের মক্কায় হজের সফর মেনে নিতে পারছিলো না। তাই সে মক্কা আক্রমণ করে কাবা শরিফ ধ্বংস করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

পরিকল্পনা মোতাবেক আবরাহা বিশাল হাতির বহর নিয়ে মক্কা আক্রমণ করে। সে ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নাজিল হয় সুরা আল-ফিল। এটি ছিল প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুনিয়ায় শুভ আগমনের ৫০ দিন আগের ঘটনা। ইসলামের ইতিহাসে এটি ‘আমুল ফিল’ হিসেবে পরিচিত। কাবা শরিফ হেফাজতে আব্দুল মুত্তালিবের বিচক্ষণ উত্তরে ছিল শিক্ষণীয়।

আবরাহার মক্কা আক্রমণের খবরে পুরো আবর গোত্রগুলো একত্রিত হয়ে গেলো। ইয়েমেনের ‘যুনকার’ নামে এক আরব ব্যক্তির নেতৃত্বে তারা একত্রিত হলো। আবরাহার সামনে যারাই গিয়েছিল তারাই পরাজিত হয়েছিল। ‘যুনকার’ আবরাহার হাতে বন্দি হলো।

কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। তিনি সারা দুনিয়ায় এক নজির সৃষ্টি করবেন। আর তা তিনি মক্কার নেতা আব্দুল মুত্তালিবের বিচক্ষণতার মাধ্যমে প্রকাশ ঘটাবেন। হলোও তাই-

কুরাইশদের উটের বিচরণক্ষেত্র দখল
সে সময় কুরাইশদের নেতা ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আব্দুল মুত্তালিব। কাবা শরিফ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ছিল তার ওপর। তিনি মক্কার নেতাও ছিলেন। আবারাহা মক্কা আক্রমণ করতে এসে কুরাইশদের উটের বিচরণক্ষেত্র দখল করে নেয়। সেখানে আব্দুল মুত্তালিবের প্রায় ২০০ উটও ছিল।

আবরাহার প্রস্তাব
আবরাহা কুরাইশ নেতাদের কাছে এ মর্মে প্রস্তাব পাঠালেন যে, কুরাইশদের সঙ্গে তার যুদ্ধ করার ইচ্ছে নেই। তার লক্ষ্য হলো শুধু কাবা শরিফ ধ্বংস করা। নাউজুবিল্লাহ! কুরাইশরা তাতে বাঁধা না দিলে তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না।

আব্দুল মুত্তালিবকে এ খবর জানানো হলে, তিনি কুরাইশদের উদ্দেশ্যে আহ্বান করলেন-
‘হে কুরাইশগণ! তোমরা ভীত হইয়ো না। এ ঘরের মালিক হচ্ছেন মহান আল্লাহ তাআলা। তিনি এর হেফাজতকারী।’

আব্দুল মুত্তালিব কয়েকজন কুরাইশ নেতা নিয়ে ‘ছাবির’ পাহাড়ে অবস্থানরত আবারহার কাছে যান। আব্দুল মুত্তালিবের উজ্জ্বল চেহারা দেখে আবরাহা অভিভূত হয়ে যান। নিজের আসন ছেড়ে নিচে নেমে আসেন এবং তাঁকে রাজ সিংহাসনে বসান।

আব্দুল মুত্তালিবের বিচক্ষণতা
এবার আব্দুল মুত্তালিব কাবা শরিফ সম্পর্কিত কোনো কথা না বলে আবরাহকে মানসিকভাবে আক্রমণ করেন। তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে আবরাহাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুমি আমাদের যে উটগুলো দখল করেছো সেগুলো ফেরত দাও।’

আবরাহা বলল, আপনাকে দেখামাত্রই আপনার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ জাগ্রত হয়েছিল। কিন্তু আপনার কথাবার্তা শুনে তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েগেছে। আপনি শুধু আপনার দুইশত উটের কথা বলছেন।’
আবরাহা আরও বলল, আপনি কি জানেন না? আমি কাবা শরিফ ধ্বংস করতে এসেছি। আপনি এ সম্পর্কে কোনো কিছুই বললেন না! এটা তো বিরাট আশ্চর্যের বিষয়ও বটে!

আব্দুল মুত্তালিবের বিচক্ষণ উত্তর-
আমি উটের মালিক, তাই উটের কথাই বললাম; কাবা শরিফের মালিক আমি নই। এর মালিক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তিনিই জানেন কিভাবে এ ঘর হেফাজত করবেন।

আব্দুল মুত্তালিবের এ উত্তরে আবরাহা উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং অহংকার ও দম্ভে গর্জে ওঠেন। আর এটি ছিল তার চূড়ান্ত ধ্বংসের কারণ।

এবার আবরাহা উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বলল, আপনার আল্লাহ, আমার হাত থেকে কাবা শরিফকে রক্ষা করতে পারবে না। নাউজুবিল্লাহ
প্রতি উত্তরে আব্দুল মুত্তালিব বললেন, ‘এবার তোমার যা ইচ্ছা তুমি তা-ই কর।’

তারপর আবরাহা তার বিশাল হাতিবাহিনী নিয়ে কাবা শরিফের দিকে উদ্যত হতেই ধ্বংসের কোপানলে পতিত হয়। সে ঘটনার বর্ণনা এসে সুরা আল-ফিল-এ।

তবে অন্য এক বর্ণনা এসেছে, আব্দুল মুত্তালিব কয়েকজন কুরাইশ সঙ্গীকে নিয়ে আবরাহার কাছে এ মর্মে প্রস্তাব করলেন যে-
তুমি আল্লাহ তাআলার ঘরে হস্তক্ষেপ না করলে আমরা সমগ্র উপত্যকার এক তৃতীয়াংশ ফসল তোমাকে খেরাজ দান করবো। কিন্তু আবরাহা এ প্রস্তাব মানতে চাইলো না। আব্দুল মুত্তালিব তার উট নিয়ে শহরে ফিরে গেলেন।

মক্কায় গিয়ে আব্দুল মুত্তালিব কাবা শরিফের চৌকাঠ ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকলেন। অন্যান্য কুরাইশরাও তার সঙ্গে দোয়ায় শরিক হলো। আর তারা আল্লাহর দরবারে ধরণা দিয়ে বললেন-
‘হে আল্লাহ! আপনিই আপনার ঘরকে হেফাজত করেন।’
ফলশ্রুতিতে মহান আল্লাহ তাআলা বিশাল হাতির বহর সমেত বাহিনীকে ধ্বংস করে দিলেন। আবরাহার হাত থেকে রক্ষা পেলো পবিত্র কাবা শরিফ।