ঢাকা, ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
shodagor.com

পুলিশের ফেনসিডিল বিক্রির ঘটনায় ধোঁয়াশা

প্রকাশিত: সোমবার, মে ৩, ২০২১ ৪:৫৮ অপরাহ্ণ  

| পিবিএন ডেস্ক

উদ্ধারকৃত মাদকের সংখ্যা নিয়ে নয়-ছয়। অভিযানের পর করা জিডিতে পৃথক বক্তব্য উপস্থাপন। আর দায়েরকৃত মামলার এজাহারে ভুল জিডি নম্বর। গেল ৩ এপ্রিল বগুড়ার শিবগঞ্জে পুলিশ কর্তৃক উদ্ধারকৃত ফেন্সিডিল বিক্রি ও এক সিনিয়র এএসপিসহ বেশকিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশা কাটাতে অনুসন্ধান চালিয়েছে বার্তাবাজার।

চুলচেরা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে গিয়ে ধরা খাওয়ার মতো ঘটনা। অভিযানের আগে ও পরে পুলিশ কর্মকর্তাদের জিডি এবং এজাহারে উদ্ধারকৃত ফেনসিডিলের সংখ্যা প্রশ্নবিদ্ধ। ওসি ঘটনার দায় এড়াতে না পারলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে রাখা হয়েছে তদন্ত কমিটিতে। এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে শিবগঞ্জের সচেতন মহলে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৩ এপ্রিল অভিযানের আগে ও পরে রীতি অনুসারে জিডিতে (জিডি নম্বর-৭৪) মোকামতলা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শাহিনুজ্জামান উল্লেখ করেন, “আমি পুলিশ পরিদর্শক শাহিনুজ্জামান, সিনিয়র এএসপি আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী ও শিবগঞ্জ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম মহোদয়ের নেতৃত্বে পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সুজাউদ্দৌলা, এএসআই মিজানুর রহমানসহ কনস্টেবল কিবরিয়া, মিজান, মাহমুদ, সজিব ও ড্রাইভার মোমিনসহ মাদকবিরোধী অভিযানে বের হলাম”।

shodagor.com

পরে অভিযান শেষে ৭৪ নম্বর জিডির বরাত দিয়ে ৭৮ নম্বর জিডিতে উল্লেখ করেন, অভিযানে আসামি নাজিম উদ্দিনের নিকট থেকে ৫০ বোতল ও সাইফুল ইসলামের নিকট থেকে ১১০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের কথা।

এই জিডি করার কয়েকঘন্টা পর ৭৪ নম্বর জিডির বরাত দিয়ে পুনরায় ৮১ নম্বর জিডিতে শাহিনুজ্জামান উল্লেখ করেন সাইফুলের নিকট থেকে ১৫০ ও নাজিমের নিকট থেকে ৫০ পিছ ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়েছে।

অভিযান থেকে ফেরার পর একই কর্মকর্তার জিডিতে এমন পৃথক তথ্য উপস্থাপন প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

এ অবস্থায় এসআই সুজাউদ্দৌলা মোট ১৬০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে পরদিন শিবগঞ্জ থানায় পৃথক দুইটি মামলা দায়ের করেন। সেইমতে জব্দ তালিকাও প্রস্তুত করেন তিনি। যাতে স্বাক্ষর করেন শিবগঞ্জ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম। কিন্তু দায়েরকৃত মামলার এজহারের জিডি নম্বর নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। বাদি সুজাউদ্দৌলা স্বাক্ষরিত এজাহারে ১৫০ নম্বর জিডি মূলে আসামী সাইফুল ইসলামের নিকট থেকে ১১০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধারের কথা উল্লেখ থাকলেও মূলত, ১৫০ নম্বর জিডিতে এ ব্যাপারে কোন কিছুর উল্লেখই নাই। মাদক বিরোধী অভিযানের জিডি নম্বর ছিলো ৭৪। এমন হযবরল অবস্থায় মামলা গ্রহণ করেন ওসি সিরাজুল ইসলাম।

এদিকে উদ্ধারকৃত ফেন্সিডিলের মধ্য থেকে ৮৮ বোতল ফেন্সিডিল বিক্রির দায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার ও বদলির বিষয়টিও পরিস্কার নয়। ইনচার্জ শাহিনুজ্জামানের করা ৮১ নম্বর জিডিতে উল্লেখ নাজিম ও সাইফুরের নিকট থেকে উদ্ধারকৃত ২০০ বোতলের মধ্য ১৬০ বোতলের মামলা দিলে ৪০ বোতল নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা থাকলেও প্রশ্ন ওঠে ৮৮ বোতল বিক্রির।

এদিকে ঘটনার ১৭ দিন পর গত ২০ এপ্রিল অভিযোগ উঠে পিংকি পরিবহের যাত্রী সাইফুলের নিকট থেকে ১৯৮ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু এজাহারে ১১০ ও ইনচার্জ শাহিনুজ্জামানের প্রথম জিডিতে ১১০ ও পরের জিডিতে ১৫০ বোতল উদ্ধার দেখানো হয়েছে।

পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা পরদিন মোকামতলা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শাহিনুজ্জামানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সের ওয়্যার হেডকোয়ার্টারে ও ফেনসিডিল উদ্ধার মামলার বাদি সাব-ইন্সপেক্টর সুজাউদ্দৌলা সরকারকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করেন। এছাড়া দায়িত্বে অবহেলায় পুলিশ সদর দফতর থেকে শিবগঞ্জ সার্কেল সিনিয়র এএসপি আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকীকে বরিশাল রেঞ্জে বদলি করেন। তবে অজানা কারনে জিডি ও এজাহার অনুসারে অভিযানের সাথে সম্পৃক্ত ওসি সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) বগুড়ার পুলিশ সুপার তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির তালিকায় ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ওসি সিরাজুল ইসলামকে রাখা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে এ প্রসঙ্গে শিবগঞ্জ থানার ওসি সিরাজুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। এজহারে উল্লেখিত ১৫০ নম্বর জিডিতে মাদকবিরোধী অভিযানের কথা উল্লেখ না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে যিনি এজাহার দিয়েছেন তার সাথে যোগাযোগ করেন।

মামলার বাদি এসআই সুজাউদ্দৌলা সরকার বলেন, আমি ১১০ ও ৫০ মোট ১৬০ বোতল ফেন্সিডিল পেয়েই মামলা দিয়েছি। এজহার সম্পর্কে তিনি বলেন, ১৫০ নম্বর জিডিতে আউট হয়ে যাওয়ার কথা আছে। অভিযানের মামলা দিলে আমরা আউটের জিডিতেই মামলা দেই।

এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ সার্কেল থেকে বরিশাল রেঞ্জে বদলি হওয়া সিনিয়র এএসপি আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানান, তার নেতৃত্বে মাদক বিরোধী অভিযানে ২ টি মামলা হয়েছে। মামলা নম্বর ৪ ও ৫। অভিযানে একজন আসামির কাছ থেকে ১১০ বোতল ও আর একজন আসামির কাছ থেকে ৫০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করেছি। এবং সেভাবেই মামলা দেয়া হয়েছে। জিডিতে ভিন্ন তথ্য কেনো এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যিনি জিডি করেছেন তিনি যদি পরবর্তীতে ভিন্ন কোন জিডি করে থাকেন সেটার দায় দায়িত্ব তার। আর মামলার এজহারে জিডি নম্বর ভুল থাকলে সেটা দেখভালের দায়িত্ব ওসির।

তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী জানান, এটি একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিলো যার রিপোর্ট আমরা দিয়েছি। তদন্তে ফেন্সিডিলের সংখ্যায় গড়মিল পেয়েছি। আর বাকি (এএসপি ও ইন্সপেক্টরদের) তদন্ত পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে করা হবে।

তবে মাদকের পরিমান যাই হোক না কেন! পুলিশের এমন প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ড চলতে থাকলে সমাজ কুলষিত হবে বলে মন্তব্য সাধারন মানুষের। পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষায় সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবেন উর্ধতন কর্মকর্তারা এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস ও মতামত কলামে লিখতে পারেন আপনিও – pbn.news24@gmail.com ইমেইল করুন  

সর্বশেষ

জনপ্রিয় সংবাদ