১৬ই আগস্ট, ২০২০ ইং, রবিবার

ফের ভারত–চীন মুখোমুখি অবস্থানে।

আপডেট: মে ৩১, ২০২০

| পিবিএন ডেস্ক

আবারও উত্তেজনা ছড়িয়েছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) ধরে। ভারত–চীন আবারও মুখোমুখি অবস্থানে। শুধু মুখোমুখি অবস্থানে বললে ভুল হবে, হাতাহাতি ও পাথর ছোড়াছুড়ির মতো ঘটনাও ঘটেছে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে। ২৮ মে ভারতের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বাড়তি সেনা মোতায়েনের ঘোষণাও আসে। উত্তর সিকিমের এই অঞ্চলে এর আগেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। কিন্তু কোনো মীমাংসা হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

বর্তমান বিরোধের সূচনা
সর্বশেষ এই বিরোধের সূচনাটি হয় ৫–৬ মে। মঞ্চটি ছিল পূর্ব লাদাখ, প্যাংগং হ্রদের উত্তর পারের এই অঞ্চলটিকে বলা হয় ফিঙ্গার–ফাইভ। ১৯৬২ সালের চীন–ভারত যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ময়দান ছিল এটি। এই অঞ্চলটির কর্তৃত্বের বিষয়টি এখনো বিতর্কের বিষয়। অনেকটা সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি প্রোটোকল মেনেই এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রিত হয়। মুশকিল হয়, যখনই কোনো একটি পক্ষ যখন অঞ্চলটিতে নিজের উপস্থিতি বাড়ায়। এবারও তাই ঘটেছে। তবে কোনো এক পক্ষ নয়, বরং উভয় পক্ষই কাজটি করেছে।

৫ মে লাদাখে এলএসির গালওয়ানে ভারতকে রাস্তা তৈরিতে চীন বাধা দেয়। একই সময় প্যাংগং হ্রদে ভারতীয় টহল দলকেও বাধা দেওয়া হয়। চার দিন পর ৯ মে সিকিম-তিব্বত সীমান্তে নাকুলায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে দুই দেশের সেনারা। দুই সেক্টরেই দুই দেশের সেনারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। ঢিল ছোড়াছুড়িও চলে। ভারত অভিযোগ করছে, চীনা সেনারা ভারতের সীমানায় ঢুকে পড়েছে। আর চীনের অভিযোগ, ভারতের আচরণ উসকানিমূলক।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এলএসির দুই পাশে উভয় পক্ষই তাঁবু ফেলেছে। চীনের দিকে তাঁবুর সংখ্যা ৮০–১০০, আর ভারত অংশে তাঁবুর সংখ্যা প্রায় ৬০টি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, ভারতের দাবিকৃত এলাকা প্যাংগং হ্রদ, গালওয়ান উপত্যকা, লাদাখের ডেমচক ও সিকিমের নাথু লায় অন্তত ১০ হাজার চীনা সৈন্য অবস্থান করছে।

১০ বছর ধরে ভারত তার সীমান্ত এলাকায় সড়ক থেকে শুরু করে বিমানঘাঁটি পর্যন্ত বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করেছে। আবার এই হিমালয় অঞ্চলের সীমান্ত ঘিরে চীনের তৎপরতাও বাড়ছে। এ সম্পর্কিত প্রতিবেদেন আল–জাজিরা বলছে, চীন নিশ্চিতভাবেই এই এলাকায় বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে ভারতকে ব্যস্ত রাখতে চায়। কারণ, সে চায় না ভারত তিব্বতের বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার বেশি সময় পাক। তবে মোটা দাগে সিকিমের নাথু লা, প্যাংগং হ্রদ ও গালওয়ানে চীনের বর্তমান তৎপরতার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো ভারত খুঁজে পাচ্ছে না।

এদিকে গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে অভিযোগের তির ছোড়া হয়েছে ভারতের দিকে। তারা বলছে, সীমান্তের চারপাশে ভারতের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভারত অবৈধভাবে সীমান্ত এলাকায় চীন অংশে প্রতিরক্ষা স্থাপনা তৈরি করেছে। ফলে চীনের সীমান্তরক্ষীদের পক্ষে একে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা দ্য ডিপ্লোম্যাট জানায়, গত জানুয়ারিতে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারাভানে ভারতের পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর–পূর্ব সীমান্ত এলাকায় নব–ভারসাম্য সৃষ্টির লক্ষ্যে সেনা উপস্থিতি বৃদ্ধির ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন, যাতে চীন বা পাকিস্তানের দিক থেকে আসা যেকোনো মাত্রার ঝুঁকি সহজে মোকাবিলা করা যায়।

ভারত–চীন কিংবা ভারত–পাকিস্তানের মতো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি শব্দটির বহুবিধ ও সুচতুর ব্যবহার রয়েছে। সে যা–ই হোক, সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা সম্পর্কে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান বলছেন, চীনের সীমান্তরক্ষীরা শান্তিবাদী। সীমন্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা কাজ করে। সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে নিজেদের মধ্যে থাকা যোগাযোগের উপায়গুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে চীন–ভারত উভয় দেশ। একই ধরনের বক্তব্য এসেছে ভারতের সেনাবাহিনীর দিক থেকেও। তারা বলেছে, পাশাপাশি দুটি দেশের মধ্যে সীমান্তে এমন ধরনের উত্তেজনা হতেই পারে।

এ ধরনের উত্তেজনা নিরসনে ভারত ও চীনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৩ সালের ওই চুক্তি অনুযায়ী ভারত–চীন সীমান্ত এলাকায় এলএসি ধরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশেরই আলোচনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা। সীমান্ত নিয়ে যেকোনো বিরোধের ক্ষেত্রে উভয় দেশ শান্তিপূর্ণ আলোচনার পথ বেছে নেবে বলে ওই চুক্তিতে তারা প্রতিশ্রুত।

এলএসি ধরে উত্তেজনা বাড়ছে
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীন সীমান্ত এলাকায় উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৭ সালে ভুটানের দোকলাম এলাকায় মুখোমুখি অবস্থানে চলে গিয়েছিল দুই দেশ। সে সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘অপারেশন জুনিপার’ নামের অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে সেখানে ২৭০ সশস্ত্র সেনার সমাবেশ ঘটায়। ওই অবস্থানটি নেওয়া হয়েছিল চীনা সেনাসদস্যদের দ্বারা নির্মাণাধীন একটি সড়কের কাজ বন্ধের লক্ষ্যে। ওই সড়ক নির্মিত হলে তা ভারতীয় সীমানায় চীনাদের প্রবেশ অবারিত করত। সড়কটি তৈরি হলে তা দোকালায় ভারতীয় ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে ফেলত এবং চীনকে জামফেরি রিজে প্রবেশের সুযোগ করে দিত। এটি একই সঙ্গে চিকেন নেক নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডরের পথটিও তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিত। এই চিকেন নেক দিয়েই উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের সঙ্গে ভারতের বাদবাকি ভূখণ্ডের সংযোগ রক্ষিত হয়। ফলে এটি ভারতের জন্য ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মজার বিষয় হলো, যে স্থানটিতে দুই দেশ পরস্পরের মুখোমুখি হয়, তা কিন্তু এদের কারও নয়। ওই স্থানটি মূলত ভুটানের। অথচ এই বিবাদে মূল দাবিদার ভুটানের দশা উলখাগড়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

সীমান্ত নিয়ে এই টানাহেঁচড়ার কারণ কী?
চীন–ভারত সীমান্তের এই অংশ ঘিরে উত্তেজনা নতুন নয়। তিব্বতের চীন থেকে আলাদা হতে চাওয়া এবং তাতে ভারতের সমর্থন দেওয়া—এই সবই এখন ইতিহাস। এ নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকটটি তৈরি হয় ১৯৫৯ সালে যখন ভারত তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামাকে আশ্রয় দে