২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার

মাঙ্গা-এনিমেঃ অবসরের সঙ্গী

আপডেট: মে ৬, ২০২০

| মো. আল জুবায়ের রনি

সমগ্র পৃথিবী এখন করোনায় আক্রান্ত। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ লোক এখন লকডাউনে। ভয়ংকর ভাইরাসের আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের বাসা-বন্দি অবস্থায় মেনে নিচ্ছেন সবাই। বাসায় বন্দি থাকাকালীন সময় কাটানোর জন্য একেক জন একেক পন্থা বেছে নিচ্ছেন। কেউ বই পড়ে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ হয়তো সিনেমা-টিভি সিরিজ দেখছেন, কেউ বা আবার অনলাইন কোর্স কিংবা অনেকে গৃহস্থলি কাজকর্ম শিখছেন। কিন্তু এসবের বাইরে ও আপনার এই অবসর সময়ের সঙ্গী হতে পারে মাঙ্গা-এনিমে।

তাহলে চলুন জেনে নেই কি এই মাঙ্গা?
আচ্ছা, মাঙ্গা মূলত জাপানিজ কমিক। সাধারনত ধারাবাহিক গল্পকে চিত্র এবং উক্তির মাধ্যমে বর্ননা করা হয় কমিক সিরিজগুলোতে। ধারনা করা হয় ১২ শতকের কোন এক সময়ে জাপানে মাঙ্গার উৎপত্তি হয়, সে সময় থেকেই মাঙ্গা এখন পর্যন্ত জাপানিজ সংষ্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে । এইসব মাঙ্গা কার্টুন সমূহ মূলত সাদা কালো ছবিতে চিত্রিত করে ম্যাগাজিনে প্রকাশের মাধ্যমে ঐতিহ্যগত ভাবে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে বৈশ্বিক চাহিদা মাথায় রেখে অনলাইন প্লাটফর্ম গুলোতে ও প্রকাশিত হচ্ছে জাপানিজ এই মাঙ্গা সিরিজিগুলো।
কথায় বলে, জাপানে টয়লেট পেপার এর জন্য না যত কাগজ লাগে তার চেয়ে বেশি কাগজের প্রয়োজন পড়ে মাঙ্গা প্রকাশের জন্য!
২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ি মাঙ্গা-এনিমের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ইউ এস ডলারের মতো (যা পৃথিবীর অনেক দেশের বাজেটের চেয়েও বিশাল)। জাপানে শিশু কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই ই মাঙ্গা পড়ে। বলা যায়, জাপানের মানুষের জীবনের একটা বিশাল অংশ থাকে মাঙ্গা-এনিমে কেন্দ্রিক। প্রতিটি কফিশপ, রেস্তোরা, শপিং মল, রাস্তাঘাট এমনকি স্কুল কিংবা অফিসেও মাঙ্গা এনিমের ছোঁয়া পাওয়া যায়।আপনি জানলে অবাক হবেন, এই এনিমে আর মাঙ্গা নির্ভর থিম পার্ক গড়ে উঠেছে জাপানে যা জাপানের অন্যতম পর্যটন আকর্ষন। এমনকি জাপানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঙ্গার ওপর কোর্স করানো হয় এবং ডিগ্রি দেওয়া হয়। শুধু জাপান ই নয়, বিশ্বব্যাপি এই মাঙ্গা পড়ুয়ার সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছেই।
প্রায় সব জন্রার মাঙ্গা পাওয়া যায় । হরর, সুপারন্যাচারাল, রোমান্স, একশন, স্কুল কমিক, ড্রামা, সাইকোলজিক্যাল, মিস্ট্রি, সাই-ফাই খুবই পরিচিত জন্রা। তবে মাঙ্গার নিজস্ব পাঠক নির্ভর শ্রেনীভাগ আছে, যেমন – Seinen, Jousei, Shojo, Shonen, Kodomo. নতুন পাঠক হিসেবে পড়ে দেখতে পারেন – “My hero academia”, “A silent voice”, “Space brothers” ।
এছাড়াও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ, ওয়েবসাইটে একজন পাঠক তার রুচি অনুযায়ী মাঙ্গা খুজে পাবেন।

এবার চলুন জেনে নেওয়া যাক তাহলে এনিমে কি?
এই মাঙ্গা কার্টুনের এনিমেশন ফিল্ম-সিরিজ গুলোই হচ্ছে এনিমে। জাপানের এনিমে এক অনবদ্য শিল্পকর্ম। শুধুমাত্র অসাধারন স্টোরি লাইনের জন্য নয় বরং গল্প বলার ধরন, থীম, অনুভূতিকে স্পর্শ করার ক্ষমতা কিংবা দৃশ্যায়ন এনিমে কে আলাদা করে রেখেছে অন্য কোন কার্টুন কিংবা টিভি শো থেকে। যারা এনিমে একবার পছন্দ করা শুরু করে, তাদের কাছে এনিমে অনেকটা নেশার মত হয়ে দাড়ায়।

তবে অন্যান্য কার্টুন বা টিভি সিরিজের সাথে এর পার্থক্য হলো এনিমে সকল বয়সের দর্শকের জন্য বানানো হয়। একজন স্কুলপড়ুয়া ছাত্র থেকে অফিসের চাকরিজীবী সবাই এনিমে দেখে। বিগত কয়েক দশক ধরে জাপানিজ এনিমে লক্ষ লক্ষ দর্শকের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে আছে এই এনিমে।

প্রায় সব এনিমেই মাঙ্গা থেকে পরবর্তীতে কম্পিউটার এনিমেশন এর মাধ্যমে তৈরী করা হয়। তাই এনিমে গুলোও মাঙ্গার মত প্রায় সব জন্রার হয়ে থাকে। সব রকম দর্শকের চাহিদা মাথায় রেখে তৈরী করা হয় বলেই এনিমের সাবজেক্টে প্রচুর বৈচিত্র দেখা যায়। স্কুল-কলেজ রোমান্স কিংবা একশন, হরর থেকে শুরু করে সিম্পল চাকরিজীবীর দৈনন্দিন কর্মকান্ড এই সব কিছু নিয়েই এনিমে সিরিজ তৈরী হয়।

তবে বেশিরভাগ এনিমে সিরিজগুলো মিক্সড জন্রার হয়ে থাকে।
IMDb রেটিং অনুযায়ি কিছু দর্শকপ্রিয় এনিমে সিরিজ হলো – One punch man, Death note, Attack on titan, Dragon ball Z, Fullmetal Alchemist: Brotherhood.
সিরিজ ছাড়াও এনিমে মুভিও খুবই জনপ্রিয়। Spirited away, Grave of the Fireflies, Your name, Wolf children, A silent voice, Akira কিছু জনপ্রিয় এনিমে মুভি লিস্ট।

উন্নত প্রযুক্তি, অসাধারন সব গাড়ি কিংবা শিক্ষা ও গবেষনায় জাপান যেভাবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে, সেভাবে মাঙ্গা-এনিমে সিরিজ গুলো দিয়ে তারা তাদের দেশের সংষ্কৃতি, শিষ্ঠাচার, মূল্যবোধ বহির্বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে সমান গৌরবের সাথে। অনেক বিতর্কের জন্ম দিলেও মাঙ্গা-এনিমে অবসরের প্রিয়তম সঙ্গী হিসাবে পাঠক-শ্রোতার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।

লেখক: শেখ তানভীর রায়হান ইমন
শিক্ষার্থী, ফার্মেসি ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়