কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দলাদলিতে অস্থিরতা - PBN24PBN24
ঢাকা, ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
shodagor.com

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দলাদলিতে অস্থিরতা

প্রকাশিত: বুধবার, জুলাই ১৪, ২০২১ ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ  

| পিবিএন ডেস্ক

পিবিএন ডেস্কঃ আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকদের তিনটি উপদল। মোট ২৫২ শিক্ষকের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন বাদে সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা না দিয়েই স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ১২তম হন এক শিক্ষার্থী। এই তথ্য গণমাধ্যমে বলে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ করেছেন—এমন অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়টির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহবুবুল হক ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু ভর্তি প্রক্রিয়ার অনিয়মে জড়িতদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিলেও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের ওই ভর্তি পরীক্ষায় ‘বি’ ইউনিটের সদস্যসচিব ছিলেন বর্তমান শিক্ষক সমিতির সভাপতি শামীমুল ইসলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের অভিযোগ, শামীমুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রার আবু তাহের সমর্থিত শিক্ষকদের পক্ষের নেতা হওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর মাহবুবুল হক ভূঁইয়া তাঁদের বিপক্ষ দলের সদস্য হওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

shodagor.com

অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ‘ছোট ছোট’ কারণে নির্দিষ্ট অংশের শিক্ষকেরা ‘হয়রানির’ শিকার হচ্ছেন। শিক্ষক এবং প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের বিবদমান তিনটি উপদলের গ্রুপিংয়ের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ভেতরে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

এই ঘটনাগুলো ছোট ঘটনা। আশা করছি, দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।

অধ্যাপক এমরান কবির চৌধুরী, উপাচার্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক এমরান কবির চৌধুরী এ বিষয়ে গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, এই ঘটনাগুলো ছোট ঘটনা। আশা করছি, দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।

২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ১৯টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। মোট শিক্ষার্থী ৭ হাজার ৭৪ জন। শিক্ষক ২৫২ জন।

একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, শুরুর দিকে নিয়োগ পাওয়া হাতে গোনা কিছুসংখ্যক শিক্ষক রয়েছেন বিএনপি-জামায়াত সমর্থক। বাকি শিক্ষকেরা প্রায় সবাই এখন আওয়ামী লীগ সমর্থক। তাঁরাই এখন তিনটি ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান রেজিস্ট্রার মো. আবু তাহের। আরেকটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান প্রক্টর কাজী কামালউদ্দিন ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন দুলাল চন্দ্র নন্দী। তৃতীয় পক্ষটির নেতৃত্বে রয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক মেহেদী হাসান (বর্তমানে শিক্ষা ছুটিতে বিদেশে), নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল হক ও রবিউল আউয়াল চৌধুরী এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাজী ওমর সিদ্দীকী।

আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকেরা ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠন করেন। কিন্তু সাবেক উপাচার্য মো. আলী আশরাফের সময়ে ২০১৭ সালে শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি শুরু হয়। ভেঙে যায় বঙ্গবন্ধু পরিষদ। তখন কাজী কামালউদ্দিন ও দুলাল চন্দ্র নন্দীর অংশটি তৎকালীন উপাচার্যের পক্ষে অবস্থান নেন। আর তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবু তাহের এবং সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের অংশটি উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন।

২০১৮ সালে নতুন উপাচার্য হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমরান কবির চৌধুরী। তখন শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি আবু তাহের বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পান। একপর্যায়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আবু তাহের এবং আইনুল হক-মেহেদী অংশের মধ্যে মিল ভেঙে যায়। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে নতুন মেরুকরণে আবু তাহেরের অংশ এবং একসময়ের বিরোধী পক্ষ হিসেবে পরিচিত কাজী কামালউদ্দিন ও দুলাল চন্দ্র নন্দীর অংশটি যৌথভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতে আবু তাহেরের পক্ষ থেকে সভাপতি এবং কামালউদ্দিন-দুলাল চন্দ্র নন্দীর পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

নির্বাচনে হেরে যায় আইনুল হক-মেহেদী পক্ষ। এই পক্ষের অভিযোগ, বর্তমান রেজিস্ট্রার আবু তাহের প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের পক্ষকে বিভিন্ন ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করছেন। পাশাপাশি নিজ পক্ষকে সুবিধা দিচ্ছেন।

অবশ্য শিক্ষকদের মধ্যে ‘গ্রুপিং’ থাকলেও এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন রেজিস্ট্রার আবু তাহের।

দ্বন্দ্বের জেরে যত সব ঘটনাঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী কৃষ্ণ কুমার সাহা ২০১২ সালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁর স্নাতকোত্তর ও এমফিল ডিগ্রির জটিলতায় বিচারাধীন থাকা অবস্থায় চাকরি স্থায়ী হয় এবং পদোন্নতি পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়ে বিদেশে স্নাতকোত্তর করেন। একইভাবে বিদেশে পিএইচডি করতে যান। কিন্তু দেশে আসার পর এখন তাঁকে পিএইচডির অবশিষ্ট কাজের জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না প্রশাসন।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে দুটি ঘটনা নিয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তার একটি হলো গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী এম আনিছুল ইসলামের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি স্থগিত রাখা। কাজী আনিছুলকে গত ফেব্রুয়ারিতে পদোন্নতি দিয়ে সহকারী অধ্যাপক করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর অগ্রায়নপত্রে লেখা ছোট একটি ভুলের অজুহাতে পদোন্নতি স্থগিত করা হয় বলে জানায় প্রশাসন। এক পক্ষের শিক্ষকেরা বলছেন, আনিছুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আইনুল-মেহেদী পক্ষ করেন বলে হেয় করতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একাংশের সাংগঠনিক সম্পাদক। আনিছুল বলেছেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে এটি করা হয়েছে।

একই বিভাগের শিক্ষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগকে ‘আক্রোশবশত’ বলছেন একাধিক শিক্ষক। তিনিও বঙ্গবন্ধু পরিষদের একাংশের নেতা।

অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, কাজী আনিছুলের প্রক্রিয়াটি যথাযথ হয়নি বলেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন ঠিকমতো কাগজ দিলে তাঁর পদোন্নতি সিন্ডিকেট দিয়ে দেবে। আর মাহবুবুল হক ভূঁইয়ার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা কমিটির ভিত্তিতে হয়েছে বলে তাঁর মন্তব্য।

বর্তমানে শিক্ষকদের বিষয়ে যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো বিবদমান তিনটি উপদলের কারণে হচ্ছে কি না জানতে চাইলে এক পক্ষের নেতা দুলাল চন্দ্র নন্দী প্রথম আলোকে বলেন, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। পারস্পরিক ভুল–বোঝাবুঝি আছে। এখান থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসা উচিত।

আরও কিছু ঘটনাঃ

গত জুনে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেন নৃবিজ্ঞান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক রবিউল আউয়াল চৌধুরী। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতা সঠিক নয় বলে তাঁর পদোন্নতির বোর্ড ডাকেনি। শিক্ষকেরা বলছেন, ওই শিক্ষক তাঁর পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা দিয়েই সহকারী অধ্যাপক হয়েছিলেন। এখন ‘প্রতিহিংসার কারণে’ পদোন্নতি আটকে রাখা হয়েছে।

এর আগে ২০১৮ সালের জুন মাসে পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করা ইংরেজি, অর্থনীতি ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের তিন শিক্ষককে সময়মতো পদোন্নতি না দিয়ে দেরিতে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মো. বেলাল হুসাইন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য ছুটি চাইলেও দেওয়া হয়নি। যদিও অন্য একাধিক শিক্ষককে দেশে পিএইচডির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য রেজিস্ট্রার বলেছেন, ভালোর জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চান, নতুন শিক্ষকেরা বিদেশে পিএইচডি করুক। শুধু পুরোনোদের দেশে এই সুযোগ দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু পরিষদের একাংশের সভাপতি মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আক্রোশবশত এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই এগুলো ঘটছে।

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস ও মতামত কলামে লিখতে পারেন আপনিও – pbn.news24@gmail.com ইমেইল করুন  

সর্বশেষ

জনপ্রিয় সংবাদ